বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক | তাং ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রী.
সমাজ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (এসপিকে) ‘র হলরুম, জামালপুর-এ বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ‘র আয়োজনে জামালপুর শহরের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জলাধার বানিয়াবাজার খাল দখল ও দূষণ নিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় এবং করণীয় নির্ধারণে এক ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফজিডি) অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শামীমা বেগম রুবি, প্রাক্তন কাউন্সিলর, ৬ নম্বর ওয়ার্ড, জামালপুর পৌরসভা এবং গৌতম চন্দ্র চন্দ, বিভাগীয় সমন্বয়কারী (ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ)। সঞ্চালনায় ছিলেন মোহাম্মদ এনামুল হক, নির্বাহী, সমাজ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (এসপিকে), জামালপুর।

এফজিডি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন—
প্রবীণ সাংবাদিক শাহ আলী বাচ্চু, বাংলাদেশ ট্যুরিজম নিউজ এজেন্সির নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক ডা. মোঃ শফিকুল ইসলাম আজাদ খান, রাজু আহমেদ,(প্রতিনিধি,পারি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন), মজনু মিয়া, (প্রতিনিধি, তরঙ্গ মহিলা উন্নয়ন সংস্থা), আবদুল আউয়াল, মুস্তাকিমা (নির্বাহী পরিচালক, রশিদপুর বটতলা সিভিও), বিবি হাওয়া (সভাপতি, মহিলা কৃষি সমিতি), নেহাজ উদ্দিন মাইজভান্ডারী (নির্বাহী পরিচালক, প্রত্যাশা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা), সাংবাদিক এমদাদুল হক, মোঃ সেলিম উদ্দিন, খাদিমুল ইসলাম সোহাস (যুবনেতা, এসপিকে) প্রমুখ।
ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন আফসানা মিমি।
ধারণাপত্র: বানিয়াবাজার খালের অতীত ও বর্তমান অবস্থা-
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অংশ হিসেবে জামালপুর শহরের পূর্ব পাশ বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে পূর্ব ও দক্ষিণ জামালপুর শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান খাল হলো বানিয়াবাজার খাল। খালটি ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী বানার নদীর উৎসমুখের পশ্চিম প্রান্তে উৎপত্তি হয়ে শহরের কুইড়া বিলের মাধ্যমে শহর রক্ষা বাঁধ ও সুইচগেইট অতিক্রম করে ঝিনাইনদীতে পতিত হয়েছে।
একসময় খালটির প্রবাহ ছিল প্রায় ১৫ কিলোমিটার; বর্তমানে তা সংকুচিত হয়ে প্রায় ২ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। জামালপুর শহরের বানিয়াবাজার, মুকুন্দবাড়ী ও বন্দেরপাড়া পর্যন্ত খালটির অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে। খালের উপর কুড়িটির অধিক সেতু রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে খালের পাড়ে বাড়িঘর, দোকানপাট এমনকি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

পরিবেশ রক্ষায় এই খালের ভূমিকা অনস্বীকার্য। খালটি রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কুফল ভোগ করতে বাধ্য হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে পুনরায় মহাপরিকল্পনা ও বিপুল বাজেট প্রয়োজন হবে, যা এড়ানো সম্ভব প্রাকৃতিক খাল সংরক্ষণের মাধ্যমে।
বানিয়াবাজার খাল ব্যবস্থাপনা:
ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস হতে উৎপত্তি হয়ে এই খাল জামালপুর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদের পানি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে কৃষি উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখতো। কুইড়া বিলের জমাট পানি নিষ্কাশন করে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ফসল ও মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো খালটি।
বর্তমানে খালটি জামালপুর পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে একটি সংকুচিত প্রবাহমান নালায় পরিণত হয়েছে। বানিয়াবাজার, মুকুন্দবাড়ী ও বন্দেরপাড়া এলাকার জমাট পানি এখনো এই খালের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়।
১৯৮৮ সালের বন্যার পর এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে পৌরসভার সহায়তায় উৎসমুখে একটি সুইচগেইট স্থাপন করা হয়। খালের উপর দিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অতিক্রম করেছে। মহাসড়কের উত্তর পাশে খালের পাড় কিছুটা সুসজ্জিত হলেও দক্ষিণ পাশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় কুড়িটিরও বেশি সেতু বা সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে, যা খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে।
উৎসমুখে খালের প্রস্থ ২০ মিটার হলেও মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে তা কমে ১০ মিটারেরও নিচে নেমে এসেছে। গাইড পিলার না থাকায় এবং অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণের ফলে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দখল ও দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট।

বর্তমান সংকট ও করণীয়:
যথাযথ পরিচর্যার অভাবে খালটি এখন বিপন্নপ্রায়। দ্রুত সংস্কার না করলে দখলমুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে। খালটি বিলুপ্ত হলে পৌর এলাকার ৫, ৬ ও ৭নং ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা নিরসনে ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণ ও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে জাতীয় সম্পদের অপচয় অনিবার্য হবে।
ইতোমধ্যে খালে পৌরবর্জ্য ডাম্পিং, পাড় দখল ও স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে দূষণ শুরু হয়েছে। খালটি মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত। জাতীয় স্বার্থে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, দখল উচ্ছেদ এবং দূষণ রোধ করে এটিকে একটি কার্যকর জলাধার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে জামালপুর পৌরসভার পূর্বাংশে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি একটি পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।
উপসংহার:
নগরের জলাধার রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। স্থানীয় নেতৃত্বকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া খাল রক্ষা সম্ভব নয়।
“আমি আমার খালকে ভালোবাসি”— এই অনুভূতি যদি সবার মধ্যে জাগ্রত না হয়, তবে টেকসই ও সুস্থ নগর গড়ে তোলা কঠিন হবে। সম্মিলিত উদ্যোগে বানিয়াবাজার খালকে রক্ষা করা গেলে একটি সুন্দর, সুস্থ, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব।